আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিজ মন্ত্রিসভার সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের কঠিন সামরিক প্রশিক্ষণের মুখোমুখি করেছেন তিনি। সেনাবাহিনীর অনুশাসন, কৌশল ও সুশৃঙ্খল মানসিকতা বেসামরিক প্রশাসনে প্রয়োগ করে দেশকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও চিত্রে দেখা গেছে, রাজধানী ও অন্যান্য প্রশাসনিক কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে দেশের প্রথম সারির আইনপ্রণেতা ও মন্ত্রীরা সেনাপোশাকে অনুশীলনে অংশ নিচ্ছেন। পূর্বাঞ্চলীয় হুরসো সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আয়োজিত এই বিশেষ ক্যাম্পে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ নিজে উপস্থিত থেকে অন্যান্য কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কুচকাওয়াজ ও বিভিন্ন সামরিক মহড়ায় অংশ নেন।
ইথিওপিয়ার ইতিহাসে বেসামরিক আমলা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এমন নিবিড় সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার ঘটনা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর ও ব্যতিক্রমী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন দেশের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হাউস অব ফেডারেশনের স্পিকার মুফরিয়াত কামিল, অর্থমন্ত্রী ফিটসুম আসেফা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মেকদেস ডাবা। তবে এই প্রশিক্ষণ ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে কিংবা ঠিক কত দিন ধরে চলবে, সে বিষয়ে সরকারিভাবে নির্দিষ্ট করে কোনো সময়সীমা প্রকাশ করা হয়নি।
এই সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ জানান, ইথিওপিয়ার জন্য সর্বজনীন সমৃদ্ধি অর্জন কেবল মুখে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন শারীরিক সামর্থ্য, নৈতিক দৃঢ়তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা। সামরিক বাহিনী থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা কীভাবে প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে পারে, সে কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সৈন্যরা মাঠে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোয়, আর বেসামরিক ব্যক্তিরা লক্ষ্য স্থির করেন সাধারণ কাঠামোর ওপর। কিন্তু দিনশেষে দুই পক্ষই বিজয়ের চূড়ান্ত স্বাদ পেতে চায়। সামরিক প্রশিক্ষণ থেকে আহরিত শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, দলগত কাজ ও জবাবদিহি সরকারি কাজের গতিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে এবং লক্ষ্য অর্জনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বর্তমান ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। ইথিওপিয়া বর্তমানে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলীয় টিগ্রে অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের স্মৃতি এখনো তাজা, পাশাপাশি আমহারা অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত এবং ওরোমিয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতা দেশকে একধরনের চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা দেশকে প্রতিনিয়ত সতর্ক অবস্থানে রাখছে। এমন নাজুক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ দেশের প্রশাসনিক যন্ত্রকে এক ছাতার নিচে এনে শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি রাখার এই অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন।