আমরা বর্তমানে যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেখানে এমন এক মাত্রার উদ্দীপনা, অনিশ্চয়তা, তুলনা এবং চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে, যা মানুষের মনকে অবিরামভাবে সামাল দেওয়ার জন্য প্রকৃতপক্ষে তৈরি করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের অনেকেই কেবল ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ নই, বরং মানসিকভাবে ক্লান্ত। কাজ, অর্থ, সম্পর্ক, পড়াশোনা, পরিবারের প্রত্যাশা এবং অনিশ্চয়তা আমাদের মনকে প্রায় স্থায়ীভাবে ‘সমস্যা সমাধানের’ অবস্থায় রাখে। আজ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও অনেকেই আগামীকাল কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন।
প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। এ দিনটি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার জন্য পুরো বিশ্বকে থামিয়ে ভাবার সুযোগ করে দেয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘অভিজ্ঞতার কথা শোনা হোক: বাস্তব কণ্ঠস্বর, বাস্তব পরিবর্তন’ (Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change), একটি সহজ প্রশ্ন সামনে আনে। যারা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেন, আমরা কি সত্যিই তাঁদের কথা শুনছি?
বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর আগামী বছরগুলোতে লাখো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ধরন নির্ধারণ করবে। এ বছরের প্রতিপাদ্য সরকার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সমাজকে আহ্বান জানাচ্ছে, যেন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের শুধু নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনাকারী হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কক্ষে অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি সর্বত্রই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। জাতীয় জরিপগুলোতে দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি পাঁচজনের প্রায় একজন কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। অথচ তাঁদের অধিকাংশই কখনো সহায়তা পান না। গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ৯০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, যাঁদের শনাক্তযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কোনো চিকিৎসা বা সেবা পান না। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মূলত শহরাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মাদকদ্রব্য ব্যবহারের সমস্যা এবং আত্মহত্যা এই বোঝাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। প্রতি বছর আত্মহত্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়; তরুণ ও নারীদের মধ্যে এর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যায় ৪ হাজার ৭১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ জন। একই সঙ্গে সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য।
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছেন একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি সমাজ, যারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন—প্রায়ই একাকী এবং নীরবে। এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ সামাজিক কলঙ্ক। অনেকেই এখনো মানসিক অসুস্থতাকে স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে না দেখে দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করেন। এর ফলে মানুষ সাহায্য চাইতে দ্বিধা করেন এবং পরিবারগুলোও খোলাখুলিভাবে এ বিষয়ে কথা বলতে পারে না। একই সঙ্গে যাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদেরও কী ধরনের সেবা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনার বাইরে রাখা হয়।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যদিও সামনে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে ১৯১২ সালের ঔপনিবেশিক আমলের আইনটি প্রতিস্থাপিত হয়। নতুন আইনটি মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা ও সম্পত্তি সুরক্ষিত করে এবং মানসিক হাসপাতালগুলোর পরিচালনা ও তদারকির জন্য নিয়ম নির্ধারণ করে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে। সারা দেশে কীভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, জনবল নিয়োগ ও অর্থায়ন করা হবে, এসব নথি সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ উদ্যোগের (Special Initiative for Mental Health—SIMH) আওতায় কাজ করছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েকটি পরীক্ষামূলক জেলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘mhGAP’ নামের একটি নির্দেশিকা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের উপযোগী করে অভিযোজিত হয়েছে। এর অর্থ হলো, গ্রামীণ এলাকার কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়া রোগী ক্রমেই দূরে কোথাও না গিয়েও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।
বাংলাদেশ এখন আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘LIVE LIFE’ উদ্যোগের অংশ। এর আওতায় তরুণদের জীবনদক্ষতা শেখানো, আত্মহত্যা বিষয়ে দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি আত্মক্ষতির উপায়গুলোর নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
সম্প্রতি হালনাগাদ করা বাংলাদেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকায় মানসিক, স্নায়বিক ও মাদকদ্রব্য ব্যবহারের সমস্যাসংক্রান্ত বিভিন্ন ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিষণ্নতারোধী ওষুধ থেকে শুরু করে মৃগীরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধও রয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এসব ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিবর্তে সমাজভিত্তিক সেবার দিকে বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ব্যবস্থায় মানুষকে হাসপাতালের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পরিবর্তে পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ যখন সমাজভিত্তিক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলছে, তখন এ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য আমাদের কাছে আরও বেশি কিছু দাবি করছে। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য শুধু সেবাব্যবস্থা গড়ে তুললেই যথেষ্ট নয়। নীতি প্রণয়ন, সেবার নকশা তৈরি এবং সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাঁদের প্রকৃত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
এর অর্থ হলো, বিষণ্নতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা একজন মানুষকে জিজ্ঞাসা করা, কোন বিষয়গুলো তাঁকে সত্যিকার অর্থে সাহায্য করেছে। আত্মহত্যার চিন্তার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন তরুণকে তাঁর মতো মানুষের জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মসূচি তৈরিতে যুক্ত করা। গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত স্বজনের যত্ন নেওয়া পরিবারগুলোর কথা শোনা এবং তাঁদের প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা বোঝা।
এ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আপনি যে পরিবর্তন আনতে পারেন, তার জন্য চিকিৎসক বা নীতিনির্ধারক হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিচার না করে কথা শুনুন: কেউ নিজের কষ্টের কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দেওয়ার চেয়ে মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক কলঙ্কের বিরুদ্ধে কথা বলুন: পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে বা অনলাইনে মানসিক অসুস্থতা নিয়ে ক্ষতিকর মন্তব্য শুনলে তার প্রতিবাদ করুন।
মানুষের খোঁজ নিন: ‘তুমি সত্যিই কেমন আছ?’—এমন একটি সাধারণ প্রশ্নও কারও জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারে।
সাহায্য নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিন: বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নীরবে কষ্ট সহ্য না করে চিকিৎসক বা মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নিতে উৎসাহিত করুন।
তাঁদের মতামতের জন্য জায়গা তৈরি করুন: আপনি যদি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে কারও জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ও মতামত জেনে নিন।
মানসিক স্বাস্থ্য অন্য কারও সমস্যা নয়। পরীক্ষার চাপের মুখে থাকা শিক্ষার্থী, কাজ ও পরিবারের দায়িত্ব সামলানো অভিভাবক, আর্থিক সংকটে থাকা কর্মী এবং একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করা প্রবীণ—সবার জীবনেই এর প্রভাব রয়েছে। এটি আমাদের প্রত্যেককে সরাসরি অথবা আমাদের প্রিয়জনদের মাধ্যমে স্পর্শ করে।
এ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে বাংলাদেশের সামনে তুলে ধরার মতো বাস্তব অগ্রগতি রয়েছে, পাশাপাশি এখনো অনেক কাজ বাকি। এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই কাজের পথনির্দেশনা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ হলেন তাঁরাই, যাঁরা নিজেরা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শোনা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের জন্য সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে।