(কুমিল্লা), আরটিভি নিউজ
‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’…, ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসোনি…’, টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’…, ‘তোরা কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া…’—এ রকম অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছিলেন শচীন দেববর্মন। শচীনকর্তার কণ্ঠের সুর আজও ছড়িয়ে আছে কোটি বাঙালির হৃদয়ে। বাংলার পাশাপাশি হিন্দি গানেও শচীন দেববর্মন এক অবিস্মরণীয় নাম।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ শচীন দেববর্মণের ৫১ তম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে কুমিল্লায় আজ থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনের শচীন মেলা- ২০২৬। এদিকে এখনও সরকারী হাঁস-মুরগির খামারের দখলে থাকা শিল্পীর পৈত্রিক বাড়ির একটি বিশাল অংশ উদ্ধার এবং বড়িটিকে ঘিরে কালচারাল কমপ্লেক্স গঠনের দাবি করেছেন শচীন প্রেমীরা!
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল থেকে কুমিল্লা শহরের চর্থার শিল্পীর পৈত্রিক বাড়িতে শুরু হবে দুই দিনের শচীন মেলা-২০২৬। এ উপলক্ষে নানান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কুমিল্লা জেলা প্রশান ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি। প্রতিবছর এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন কুমিল্লা ও আসপাশের এলাকার সংস্কৃতিমনা মানুষ।
একই মাসে জন্ম ও মৃত্যু হওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই সুরসম্রাটের বাড়িটিতে আয়োজন করা হয় শচীন মেলার। এবারও তার প্রয়াণদিবসে দুই দিনব্যাপী মেলা বসেছে শচীনকর্তার বাড়িতে। বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বেলুন উড়িয়ে এই মেলার উদ্বোধন করেছেন জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে এই মেলা। শচীন মেলা উপলক্ষে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে।
কুমিল্লায় তার পৈত্রিক বাড়িতেই সচীনের সঙ্গে সংগীতের আসর বসাতেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ দেশের খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞরা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শচীন কর্তার কুমিল্লার বাড়িটিতে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন করে পাকিস্তান সরকার। সামাজিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র তৎপরতায় বাড়িটি নজরে আসে জেলা প্রশাসনের। ২০১৩ সালে বাড়িটির একাংশ আংশিকভাবে বেদখল মুক্ত করে ২০১৪ সালে বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন জেলা প্রশাসন। তবে, বাড়িটি সংস্কার করা হলেও জন্ম-মৃত্যুদিন ছাড়া বছরজুড়ে বাড়িটি থাকে অরক্ষিত। শচীনের পৈত্রিক বাড়িটিতে সরকারের সময়োপযোগী পরিকল্পনার দাবি সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
কুমিল্লার ইতিহাস–গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, আমাদের অহংকারের ধন, সুরের রাজকুমার শচীন দেববর্মনকে আমরা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। শচীনকর্তার জন্ম ও মৃত্যুতারিখ এলেই আমাদের ঘুম ভাঙে। তার স্মৃতি ও সংগীতকে ধরে রাখার জন্য এবং তার কর্মকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় কিংবা সাংগঠনিক তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। কুমিল্লার নাগরিক সমাজের পক্ষে শচীনকর্তার বাড়িটিতে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার জন্য দাবি জানাই।
আহসানুল কবীর আরও বলেন, শচীনকর্তার বাড়িতে গানের জলসায় অনেক খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ আসতেন। কবি নজরুলও অনেকবার গানের জলসায় অংশ নেন। জাতীয় কবির বেশ কয়েকটি গানেও সুর দিয়েছেন শচীনকর্তা।
শচীন ১৯০৬ সালের পহেলা অক্টোবর কুমিল্লা শহরের চর্থার এই বাড়িতে, ত্রিপুরার রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মোম্বাইয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। গেলো ১০ জুলাই শুক্রবার শচীন কর্তার বাড়িটি পরিদর্শন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় তিনি বাড়িটি নিয়ে সরকারের নানান পরিকল্পনার কথা জানান।
শচীন দেববর্মনের বাবা ছিলেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার রাজপরিবারের সন্তান সংগীতশিল্পী নবদ্বীপ চন্দ্র দেব। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি সপরিবার কুমিল্লা চলে আসেন। চর্থায় তাদের বাড়ির জমি দিয়েছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেসা। শচীন দেববর্মনের সংগীতপ্রতিভার বিকাশ ঘটে শিশুকাল থেকেই। শচীন দেববর্মন কুমিল্লায় ছিলেন ১৯২৪ সাল পর্যন্ত। ১৯ বছর বয়সে তিনি চলে যান কলকাতায়, সেখানে থাকতেন ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত। ১৯৪৪ সালে তিনি সপরিবার মুম্বাই চলে যান। মুম্বাই চলচ্চিত্রজগতে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের মর্যাদা লাভ করেন। ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে।
১৯৬৯ সালে ‘আরাধনা’ হিন্দি ছবিতে শ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক হিসেবে তিনি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তার স্ত্রী মীরা দেবীও এ উপমহাদেশের অন্যতম সুগায়িকা এবং দক্ষ গীতিকার ছিলেন। স্ত্রীর রচিত বহু গান শচীন দেববর্মন গেয়েছেন। শচীন দেব বর্মন ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মারা যান। তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান মুম্বাইয়ে সম্পন্ন হয়।