থাইল্যান্ডের একটি কারাগারে বন্দি আমজাদ হোসেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারি সহায়তার জন্য গত দুই মাস ধরে সবখানে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন স্ত্রী সুমনা আক্তার।
কিন্তু আমজাদকে ফিরিয়ে আনতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সংবাদ পাননি সুমনা।
কারাগারে স্বামীর বন্দি থাকার খবর তিনি বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক মিশনের কাছ থেকে পাননি। বরং গত সাড়ে তিন মাসে ওই একই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে স্বামীর খোঁজ পান সুমনা।
থাইল্যান্ডের কারাগার থেকে ফেরা ২৪ বাংলাদেশি জানিয়েছেন বন্দি থাকা অবস্থায় নির্যাতন ও পাচারের শিকার হওয়ার নির্মম অভিজ্ঞতার কথা।
পরিবারের আর্থিক অনটন মেটাতে ৪১ বছর বয়সী আমজাদ গত বছরের ডিসেম্বরে কাজের আশায় দেশ ছাড়েন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি পাচারের শিকার হয়ে লাওস ও কম্বোডিয়াসহ কয়েকটি দেশ ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঠাঁই পান থাইল্যান্ডের এক কারাগারে।
সেখান থেকে ২৪ বাংলাদেশি দেশে ফেরার সময় তাদের কাছে দিয়েছিলেন স্ত্রীর ফোন নম্বর। তারাই এসে সুমনাকে জানিয়েছেন আমজাদের বর্তমান পরিস্থিতির তথ্য।
৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে রাজবাড়ীতে থাকেন সুমনা। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতার আবেদন জানিয়ে দুই মাস আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত করি। আমি স্বামীকে জীবিত ফেরত চাই। তার লাশ চাই না, লাশ দিয়ে কী করব? আমি আর এই মেয়ে ছাড়া এই পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই। আমরা আবার তাকে দেখতে চাই।'
এই পরিবারটির এমন করুণ অভিজ্ঞতাই জানান দেয় বিদেশে বন্দি স্বজনদের তথ্য সংগ্রহ, আইনি সহায়তা ও দেশে ফিরিয়ে আনার সময় তাদের কত ধরনের ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে ১৫ হাজার ২১৩ বাংলাদেশি বন্দি আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে সৌদি আরবে, এরপরেই রয়েছে মালয়েশিয়া ও ভারতে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩০ সেপ্টেম্বরের ডেটাবেজ অনুযায়ী, শুধু জেদ্দাতেই অন্তত ৫ হাজার ৪৮০ বাংলাদেশি আটক আছেন।
গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বন্দি আছেন।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় ২ হাজার ২১৭ জন ও ভারতে ১ হাজার ৪৪৪ বাংলাদেশি বন্দি আছেন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যে আরও দেখা যায়, দুবাইয়ে ৭৪০ জন, ওমানে ৪০০, লিবিয়ায় ৩১৪, গ্রিসে ৩০৭, কুয়েতে ২৯৬, ভিয়েতনামে ২৫০ এবং থাইল্যান্ডে ১২৭ বাংলাদেশি আটক আছেন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বন্দিদের মধ্যে অনেকে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও অনেকে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বা বৈধ নথিপত্রের অভাবে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে আটক হন।
আটক পরিবারগুলোর অনেকের অভিযোগ, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সৌদি আরবের কারাগারে ৯ মাস বন্দি ছিলেন সিলেটের তিন ভাই। তাদের অভিযোগ, মিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও যে সহায়তা তারা পেয়েছেন, তা একদম না পাওয়ার মতোই।
সিলেট সদরের কালারুকা এলাকার আব্দুর রহমান ২০১৯ সালে সৌদি আরবে যান। এর এক বছর পর তার বড় ভাই রিয়াজ উল্লাহ এবং ২০২৩ সালে ছোট ভাই মোহাম্মদ আলী সৌদি যান।
রিয়াদে থাকার সময় একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তারা গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার আগে তারা টানা ৯ মাস কারাগারে কাটান।
আব্দুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পরিবারের কথা ভেবে আমরা দিনরাত কাজ করেছি। তারপর একদিন একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না।'
তার অভিযোগ, মিশনে যোগাযোগ করা হলেও বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিবার তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের মুক্তির দাবিতে বাংলাদেশে একাধিক মানববন্ধন ও মিছিল করার পর সংশ্লিষ্ট মিশন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
এমনকি মুক্তির পরও দেশে ফেরার টিকিটের জন্য পরিবার থেকে টাকা নিতে হয়। তিন ভাইকে মোট ৬ হাজার সৌদি রিয়াল জোগাড় করতে হয় দেশে ফিরে আসতে।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কনস্যুলার সহায়তার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের একটি গোপনীয় স্মারক থেকে জানা যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর পাওয়া বন্দিদের তালিকায় নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম থাকলেও তাতে তাদের মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল না।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ মিশনকে তাদের রায় বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগে কোনো তথ্য জানায়নি। দুই পরিবারই আইনি সহায়তার জন্য আবেদন করেনি।
পরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে এবং আদালতের রায়ের কপি পেতে বাংলাদেশ একটি কূটনৈতিক নোট পাঠায় সৌদি কর্তৃপক্ষকে।
কিন্তু তালিকা পাওয়ার পর থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দুই সপ্তাহে সাজাপ্রাপ্তদের আইনি অবস্থা মিশন পর্যালোচনা বা ফলোআপ করেছিল কি না, তা এখনো অস্পষ্ট।
এ ক্ষেত্রে মিশনের ভূমিকা পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ।
বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলো জানিয়েছে, তারা নিয়মিত কারাগার পরিদর্শন করে, আইনি সহায়তা দেয় এবং আটক নাগরিকদের সহায়তায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ মিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান ডেইলি স্টারকে জানান, তারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের সমস্যার কথা শোনেন।
তিনি জানান, আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তায় আইনজীবী নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং চুক্তি সই হলেই তারা আদালতে প্রবাসীদের পক্ষে লড়তে পারবেন।