উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করতে প্রশিক্ষণ জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। এদিকে, নতুন একটি সেতু দিয়ে চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে তার পৌঁছানোর খবর জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম ইয়োনহাপ।
আজ শনিবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানায়, পিয়ংইয়ংয়ে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর কোম্পানি কমান্ডারদের দুই দিনের সম্মেলনে কিম এ নির্দেশ দেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্মেলনে কিম ‘কোরীয় ধাঁচের সামরিক বিপ্লবের’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রতিটি কোম্পানিকে সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে শক্তিশালী, দক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ-ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিটে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কেসিএনএর ভাষ্য, ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতাসীন দলের কংগ্রেসের পর এই প্রথম পুরো সেনাবাহিনীকে নিয়ে এমন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। ওই কংগ্রেসে কিম প্রচলিত সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া বেশ কয়েকটি অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ধরনের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী টর্পেডো ব্যবস্থা এবং একটি মধ্যম পাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। দেশটির দাবি, অস্ত্র দুটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের মর্যাদা নিজেদের আইনে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেশটির সরকার বারবার জানিয়েছে, তাদের স্থায়ী পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে এবং এ অবস্থান থেকে তারা সরে আসবে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, কিম জং উন চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে পৌঁছে থাকতে পারেন। নতুন নির্মিত নিউ ইয়ালু নদী সেতু দিয়ে তিনি চীনে প্রবেশ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সরকারি সূত্র এএফপিকে জানায়, কিম ওই সেতু দিয়ে দানদংয়ে পৌঁছেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সূত্রটি বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
পরে দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপও অজ্ঞাতনামা সরকারি সূত্রের বরাতে জানায়, দিনের শুরুতে কিম নতুন সেতু দিয়ে চীনে প্রবেশ করেন। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে এএফপি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার লেনের নিউ ইয়ালু নদী সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ২০১৪ সালে। তবে উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্কসংক্রান্ত অবকাঠামোর অভাবে এটি চালু হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। প্রায় ১২ বছর পর, গত সপ্তাহে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়।
উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশটির জন্য বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তার উৎস।
কিমের সম্ভাব্য এ সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সোমবার বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। এতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে
কিমের সামরিক শক্তি বাড়ানোর আহ্বানও এমন এক সময়ে এলো, যখন দুই কোরিয়ার সীমান্ত নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। সীমান্ত পরিস্থিতি স্পষ্ট করা এবং দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা পুনরায় চালুর লক্ষ্যেই এ প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এর আগে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত অসামরিকীকৃত অঞ্চলে (ডিএমজেড) একটি বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা আহত হন। সিউলের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা স্থলমাইন থেকে বিস্ফোরণটি ঘটেছে। তবে পিয়ংইয়ং এ অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষমা চাওয়ার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার আগের দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছিল উত্তর কোরিয়া।
শুক্রবারের আলোচনার প্রস্তাবের বিষয়ে পিয়ংইয়ং এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান হয়েছিল যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে, কোনো শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নয়। ফলে দুই দেশ এখনো কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে উঠেছে পিয়ংইয়ং। রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা দিতে সেনা পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া। এর বিনিময়ে দেশটি অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামরিক প্রযুক্তি পাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং গত সেপ্টেম্বরে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি অবিলম্বে পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত কর্মসূচিটি স্থগিত রাখার বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে। এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের উদ্যোগের ফলে উত্তর কোরিয়াকে কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া হতে পারে। একইসঙ্গে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার ত্যাগ না করেই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পেতে পারে পিয়ংইয়ং।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অবস্থানেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের বাস্তবতাকে পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত জুনে পিয়ংইয়ংয়ে কিমের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর দুই দেশের সরকারি বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।