বাংলাদেশের নন্দিত অভিনয়শিল্পী বিপাশা হায়াত। নব্বইয়ের দশকজুড়ে ছোট পর্দার অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। কালজয়ী ধারাবাহিক ‘অয়োময়’ নাটকে অভিনয় করেছেন। ‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় অভিনয় করে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘জয়যাত্রা’য় অভিনয় করেও ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। বিখ্যাত অভিনেতা আবুল হায়াত তার বাবা।
অভিনয়শিল্পী ছাড়াও তিনি একজন নাট্যকার ও চিত্রশিল্পী। শিল্পীজীবনের নানাদিক নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন বিপাশা হায়াত।
দ্য ডেইলি স্টার: চিত্রশিল্পী হিসেবে আপনার কাজ নিয়ে জানতে চাই…
বিপাশা হায়াত: ছবির ভাষা সর্বজনীন। আমি ছবি আঁকি না, প্রকাশ করি। ক্যানভাস বা কাগজে যা প্রকাশ করছি, তা হচ্ছে আমার মনোজগৎ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই সর্বজনীন ভাষার মাধ্যমে যুক্ত হন। সেজন্যই বলি, আমি ছবি আঁকি না, প্রকাশ করি।
সারা বিশ্বের ২০ জন শিল্পীকে নিয়ে একটি বই বের করা হয়েছে, যারা ‘আর্ট অ্যান্ড জাস্টিস’ নিয়ে কাজ করেছেন। আমিও তাদের একজন। ইতালি ভাষার এই বইটি অ্যামাজনে পাওয়া যায়। তারা আসলে আমাকে না, আমার কাজকে নির্বাচিত করেছেন।
ডেইলি স্টার: কবিতা আপনাকে কতটা পাল্টে দিয়েছে?
বিপাশা হায়াত: কবিতা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। যদি এভাবে বলি, তাহলে বলব, কবিতা আমার জীবনকে বিভিন্ন বাঁকে পাল্টে দিয়েছে।
জীবনের প্রথম দিকে পড়া, ভালো লাগা ও মুগ্ধ হওয়া কোনো কবিতার কথা বলতে গেলে ‘প্যাট্রিয়ট’-এর কথা আসবে। তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। একজন বীর যখন পৃথিবী জয় করে নিজের শহরে প্রবেশ করেন, তখন তাকে গোলাপ ছিটিয়ে স্বাগত জানানো হয়। আর যখন হেরে যান, তখন তার দিকে পাথর ছুড়ে মারা হয়। মানুষের মধ্যে কত পরিবর্তন!
‘দ্য রাইম অব দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনার’ কবিতার কথাও বলব। একজন মানুষ পাপ করেছেন। তিনি মানুষকে ধরে ধরে তার গল্প বলতে চান। ‘জীবে দয়া করে যে জন’—এ কথাটিও সেখানে বলা আছে। তিনি পাখিটিকে মেরে ফেলেছিলেন। পাখিটি ছিল অ্যালবাট্রস। চমৎকার একটি কবিতা। এটি অনেক বড়।
বাংলা সাহিত্যের অনেক কবিতাই আমার পছন্দ। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অসাধারণ বোধ আছে। তিনি কত রকমের নতুন ভাবনা দিয়েছেন!
ডেইলি স্টার: মঞ্চেও অনেক দিন অভিনয় করেছেন?
বিপাশা হায়াত: সৈয়দ শামসুল হকের ‘খাট্টা তামাশা’ নাটকে অভিনয় করেছি। তখন আমার বয়স ২১-২২ বছর। দেওয়ান গাজীর ‘কিসসা’ করেছি। ‘অচলায়তন’ করেছি। এই নাটকগুলোতে যে সংলাপগুলো ছিল, সেগুলো তো কবিতার মতো। চরিত্রটি হয়ে ওঠার জন্য যে পোশাক পরতে হয়েছে, যেভাবে চিন্তা করতে হয়েছে—সবই ছিল দুর্দান্ত।
ডেইলি স্টার: রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’র কথা যদি বলি?
বিপাশা হায়াত: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদায় অভিশাপ’ কবিতার কথা বলছি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় কবিতাটি পড়েছি। গীতিনাট্য হিসেবে ‘দেবযানী’ করেছিলাম। বিজরী নেচেছিল, আর আমি আবৃত্তি করেছিলাম। তখন আমার বয়স ১৩-১৪ বছর।
‘শেষের কবিতা’র যে নাটকটি ছিল, তার ক্যাসেটও ছিল। বাবার কাছে শুনেছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ছিল তাতে। ওই ক্যাসেট না শুনলে ঘুম হতো না। উপন্যাসটিও পুরোটা মুখস্থ ছিল। প্রতিরাতে আমি শুনতাম। বাবার কাছ থেকেই এসব পেয়েছি। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের যেসব শিক্ষক কবিতা পড়াতেন, তারা অসাধারণভাবে পড়াতেন।
ডেইলি স্টার: আপনি তো লেখালেখিও করেন?
বিপাশা হায়াত: চিন্তা করে লিখিনি। বাবা লিখতেন, আর আমি পড়তে পছন্দ করতাম। ছোটবেলায় যখন বই পড়তাম, তখন মনে হতো, আমিও লিখব। কোনো লেখা পড়ে ভাবতাম, এ রকম তো আমিও লিখতে পারব। এসব ভাবতাম। যদিও ভাবনাগুলো মজার ছিল। মনে হতো, একটা গল্প লিখি।
ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম লিখেছিলাম। সেই লেখাটি আম্মার বাসায় থাকতে পারে।
একটা সময় সঞ্জীব দা, তাপস দা ও সাজ্জাদ শরীফ ভাই গল্প দিতে বলতেন। তখন তারা ভোরের কাগজে ছিলেন। তাদের কথায় লেখা শুরু করি। পরে আনিসুল হকও লেখা দিতে বলতেন। এভাবেই লিখেছি। অনেক দিন আগে সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ ভাই আমার একটি বই প্রকাশ করেছিলেন।
ডেইলি স্টার: ‘জোছনাকাল’ ও ‘শঙ্খবাস’-এর মতো নাটক লিখে আপনি দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন। আরও নাটক লিখেছেন। সে বিষয়ে জানতে চাই।
বিপাশা হায়াত: ‘শঙ্খবাস’ নাটকটি লেখার পর চারপাশের মানুষগুলোকে নতুন করে দেখেছি। আবার ‘জোছনাকাল’ নাটকে একটি নিরীক্ষা করেছি সম্পর্কগুলোর দূরত্ব নিয়ে। কাছের মানুষ একসময় দূরের মানুষ হয়ে যায়। সম্পর্কগুলোর মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা নিয়েই কাজ করেছি। পরে অনেকেই বলেছেন, এটি তো তাদের নিজেদের জীবনের গল্প। সব সময় দর্শকের আসনে বসে ভেবেছি, আমি দর্শক হলে কী করতাম।
ডেইলি স্টার: অভিনয় থেকে দূরে আছেন। এক্ষেত্রে কোন ভাবনা কাজ করে?
বিপাশা হায়াত: আমি অপেক্ষায় আছি। প্রচুর প্রস্তাব আসে। সিনেমার প্রস্তাব তো আসেই, নাটকেরও আসে। দেশে আসার পরও প্রস্তাব এসেছে। যারা প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলো দেখেছি; কিন্তু এগোতে পারিনি।
প্রথমত, ভালো গল্প দরকার। ভালো আইডিয়া দরকার। আমার ভেতরে যা তৈরি হবে, তা সমাজে কতটা প্রতিফলিত হবে, সেটিও ভাবি। শিল্পের কিন্তু একটা উদ্দেশ্য আছে। সত্যিকারের শিল্পে দর্শন থাকতে হয়। সংলাপ লিখে গেলেই সেটি নাটক হয়ে যায় না। সংলাপ কিন্তু নাটক নয়। নাটকের জন্য একটা তাড়না দরকার। সেই জায়গাটা এখন অনুপস্থিত। এ জন্যই সে রকম গল্প ও চিত্রনাট্যের অপেক্ষায় আছি।
ডেইলি স্টার: তৌকীর আহমেদ আপনার জীবনসঙ্গী। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব কতটা?
বিপাশা হায়াত: আমার জীবনসঙ্গী ও বন্ধু—দুটোই সে। শিল্পের সঙ্গে আমাদের বসবাস। শিল্পের প্রতি তার সম্মান আছে, আমারও আছে। আমি স্বাধীনতাচেতা মানুষ। বিয়ের আগে টানা নয় বছর একসঙ্গে কাজ করেছি।
মানুষ হিসেবে তাকে দেখি। পুরুষ নাকি নারী, তা নয়—আগে মানুষ। দুজনেরই নিজস্ব ভাবনা আছে। তৌকীর আমাকে এমন একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছে, যে স্বাধীনচেতা হিসেবে বড় হয়েছে। আমি কীভাবে ভাবি, তা সে জানে। নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখে। আমি যেভাবে দেখতে ভালোবাসি, তৌকীরও একইভাবে দেখতে ভালোবাসে। আমাদের নিজস্ব ভাবনা আছে, নিজস্ব শিল্পজগৎ আছে।
ডেইলি স্টার: আপনি সিনেমা বানাতে চান। সেটা সম্পর্কে জানতে চাই।
বিপাশা হায়াত: খুব ইচ্ছে আছে। চিত্রনাট্যের কাজের পরিকল্পনা করেছি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা হবে। দায়বদ্ধতা থেকে কাজটি করব। যদি বেঁচে থাকি, তিন বছর পর কাজ শুরু করব। গল্পটা বাঁচিয়ে রাখতে চাই, অনুভূতি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। তাই সিনেমাটি বানাব। চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার জন্য নয়। সিনেমাটি তৈরি হবে কি না, তা-ও জানি না।
আমি মুক্তিযুদ্ধের সন্তান। আমার জন্ম ১৯৭১ সালে। আমি বাংলাদেশের একজন মানুষ, যেখানেই থাকি না কেন, ফিরে আসতেও পারি। আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও ভাবনার প্রকাশ হবে এই সিনেমার মাধ্যমে।