আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা, দেশের মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করতে বর্তমান সরকার সফট পাওয়ারের হাতিয়ার হিসেবে সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
আজ রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘কাজী নজরুল ইসলাম : দ্য ইউনিভার্সাল ভয়েস অব ফ্রিডম অ্যান্ড হিউম্যানিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সেমিনারের আয়োজন করে। আলোচনা পর্বের পর এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শামা ওবায়েদ বলেন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, তীব্র ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও পরিচয় তুলে ধরার জন্য সংস্কৃতিকে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এমন একটি পরিবেশে কূটনীতি কেবল সংলাপ, আলোচনা বা প্রথাগত উপায়ের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। বিশ্বের এখন সংস্কৃতির শক্তির প্রয়োজন।
শামা ওবায়েদ জানান, সৃজনশীল মেলবন্ধন ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক, আস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চায়।
মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে এবং সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রতি যৌথ অঙ্গীকার শক্তিশালী করতে একটি অভিন্ন প্ল্যাটর্ফমের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সম্প্রীতি ও মানবিক সংহতির কবি হিসেবে বর্ণনা করে শামা ওবায়েদ বলেন, সীমানা পেরিয়ে মানবতার বার্তা পৌঁছে দিতে তার সৃষ্টি সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও সঙ্গীতের ঐতিহ্য প্রমাণ করে যে সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি কীভাবে ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করতে পারে, সমাজগুলোকে যুক্ত করতে পারে এবং জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতাকে এগিয়ে নিতে পারে।
শামা ওবায়েদ বলেন, নজরুলের দর্শন বাংলাদেশের পরিচয় এবং শান্তি, সহনশীলতা ও আন্তর্জাতিক সমঝোতা বৃদ্ধিতে দেশটির প্রচেষ্টার সঙ্গে আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, নজরুলের গুরুত্ব কেবল স্মরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তার জীবন, সাহিত্যকর্ম ও সর্বজনীন বার্তা বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করার এক বিরাট সুযোগ রয়েছে।
শামা ওবায়েদ আরও বলেন, নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দর্শন সহনশীলতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া বাঙালি পরিচয় গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
এই মূল্যবোধগুলো বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গভীরভাবে প্রোথিত এবং তা সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে নজরুলকে তুলে ধরা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আত্মবিশ্বাসী দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করবে।
প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সৃষ্টিকর্মের চর্চা বৃদ্ধি পেলে নজরুল-দর্শনের মূল্যায়নের পরিধি প্রসারিত হবে এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচিত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান ও কবি আবদুল হাই শিকদার।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন।