বিশেষ প্রতিবেদক
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো প্রণয়নের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই তথ্য জানানো হয়। বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে সরকার এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সরকারের নীতি ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবং বর্তমান বাজার বাস্তবতার সাথে সংগতি রেখে নতুন পে স্কেলের রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার পর এই বেতন কাঠামো এখন বাস্তবায়নের প্রায় চূড়ান্ত ধাপে উপনীত হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রশাসন নির্বাচনী ও নীতিগত প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়েও নাগরিক ও সরকারি খাতের কল্যাণে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি কর্মচারীদের সেবামুখী কাজের গতি ত্বরান্বিত করতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি কাঠামোর বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর থেকে গত এক দশকে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মূল্যস্ফীতি, বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সরকারি কর্মচারীদের বাস্তব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য পূর্ববর্তী কাঠামোর ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর ফলে নতুন একটি পূর্ণাঙ্গ পে স্কেল ঘোষণার দাবি বিভিন্ন সময়ে সরকারি বিভিন্ন ফোরাম থেকে উত্থাপিত হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বেতন স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব, সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা এবং জাতীয় রাজস্ব আয়ের ভারসাম্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে জাতীয় বাজেটে বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়ে। ফলে সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও রাজস্ব স্থিতিশীলতা বজায় রেখেই এই চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করছেন। নতুন এই পদক্ষেপ কেবল সরকারি কর্মচারীদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করবে না, বরং সামগ্রিক জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কাজের উদ্দীপনা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
একই সভায় সরকারের শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতিও সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা বেসরকারি এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর ভাতার সংকট সমাধানের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট তহবিল থেকে অতীতে সৃষ্ট ঘাটতির কারণে ২০২২ সালের পর থেকে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি প্রাথমিক ধাপে দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়ের মাধ্যমে শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া সক্রিয় করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনকল্যাণমুখী ও সেবামূলক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। চূড়ান্ত হতে যাওয়া নতুন পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ শিগগিরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হবে। নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর হলে তা দেশের সরকারি সেবা খাতের সামগ্রিক গতিশীলতায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।