অর্থনৈতিক সমীক্ষা ছাড়াই যেন উড়োজাহাজ কেনার ধুম পড়েছে। সক্ষম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না হলে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তবে বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, চাহিদার ভিত্তিতে কেনা হচ্ছে।
১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সংস্থাটি যখন গলদঘর্ম, ঠিক তখনই বিমানের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরো ৩৫টি উড়োজাহাজ। এগুলোর মধ্যে ২৫টি মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের এবং ১০টি ইউরোপিয়ান এয়ারবাসের । আগামী তিন থেকে ১০ বছরে পর্যায়ক্রমে সরবরাহ করা হবে এসব উড়োজাহাজ।
এ লক্ষ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে গত এপ্রিলে ১৪টি এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। আর এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই হয় গতকাল বুধবার। দেশের ইতিহাসে নজির সৃষ্টিকারী একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তে নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট সব মহল। বিষয়টিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন উঠেছে, এতগুলো উড়োজাহাজ দিয়ে বাংলাদেশ কী করবে? কোথায় এগুলো রাখা হবে? কারা করবেন রক্ষণাবেক্ষণ? পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা ছাড়া বিশাল এই ক্রয় দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। যদিও বিমানমন্ত্রীর দাবি, বিমানের চাহিদার ভিত্তিতে যথাযথ প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই উড়োজাহাজগুলো কেনা হচ্ছে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজ কেনার কোনো পরিকল্পনাই সংস্থাটির ছিল না। তারা কেবল ১০টি উড়োজাহাজ ভাড়া নিয়ে বহর সমৃদ্ধ করার কথা ভাবছিলেন। ফলে এ-সংক্রান্ত কোনো সমীক্ষাও চালানো হয়নি। বিমানের সক্ষমতা সম্পর্কে বোয়িং ও এয়ারবাসের পর্যবেক্ষণও সুখকর নয়।
বোয়িংয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের অন্য যেকোনো বহরের চেয়ে বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটি বেশি। যদিও সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা জোর দিয়েই বলছেন, কোনো ধরনের চাপ বা আন্তর্জাতিক সমীকরণ থেকে নয়; বিমানের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই এসব উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।
এতবড় বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমানের আছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন মন্তব্য করে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমান গত ৫৪ বছরে নিজেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে এটি সরকারি করপোরেশন হিসেবে গড়ে উঠেছে, এয়ারলাইনস হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সক্ষম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না হলে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো বিমানের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে আশঙ্কা করে তিনি বলেন, যাত্রীসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে পারলে নতুন উড়োজাহাজ কেনাটা বাংলাদেশের জন্য লাভজনকই হবে।
একসঙ্গে অনেকগুলো উড়োজাহাজ কেনার পেছনে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা বাণিজ্য ঘাটতির বিষয় কাজ করছে মন্তব্য করে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বাজারের কথা চিন্তা করলে বিমানের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদের কৌশল কী? তারা কি চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েছে? এগুলো পরিষ্কার করতে হবে।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কি না, সে আলোচনা তো আছে। যথাযথ পরিকল্পনা নিতে পারলে এই পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ লাভবানও হতে পারবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এজন্য পর্যাপ্ত প্রকৌশলী ও পাইলট তৈরি এবং প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
নতুন ১১টি এয়ারবাস এবং ১০টি বোয়িং কেনার এই আলোচনায় অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসছে। প্রশ্নগুলো হলোÑএতগুলো উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আদৌ দরকার আছে কি না, উড়োজাহাজগুলোর মোট মূল্য কত, মোটা অঙ্কের এই বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, উডোজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত কি জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কি কারো চাপে নেওয়া হয়েছে, সুদহার কত হবে, বাংলাদেশ সরকার কি সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে, এ ঋণ কত বছরে পরিশোধ করা হবে, ঋণ পরিশোধের চাপ সরকার সামলাবে কীভাবে, উড়োজাহাজগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা কি বাংলাদেশের আছে, এজন্য প্রয়োজনীয় সিইও, প্রকৌশলী, পাইলট আসবে কোথা থেকে? সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑএতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বা সরকার কি কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে?
আনুষ্ঠানিকভাবে দাম প্রকাশ করা না হলেও প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ২৫টি বোয়িং কিনতে ৬.৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা) খরচ হবে। ১০টি এয়ারবাসের দাম যোগ করলে মোট ক্রয়মূল্য লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের অনুমান। বিপুল এই অর্থ পরিশোধে বিমানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অবশ্য তারেক রহমান সরকারের চলতি মেয়াদে এ মূল্য পরিশোধ করতে হবে না। এসব বিমান পর্যায়ক্রমে ডেলিভারি দেওয়া হবে এবং মূল্য পরিশোধ করতে হবে ডেলিভারির সময়। প্রথমটি আসবে ২০৩১ সালে এবং সবশেষ বিমান আসবে ২০৩৫ সালে বা তারও পরে। পুরো অর্থায়ন ও ডেলিভারি সময়টা বর্তমান সরকারের মেয়াদের বাইরে। এতে চাপ বাড়লেও তা পড়বে পরবর্তী সরকারের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে একটি বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। আবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে শুরু হওয়া আলোচনার ধারাবাহিকতা রক্ষার পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হয় সরকারকে।
কিছুদিন আগে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এয়ারবাস কেনার ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শারলে। তিনি বলেছিলেন, এয়ারবাস কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত ইউরোপের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ৫০ শতাংশ ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হয়। ফলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্যও বড় স্বার্থের বিষয়।
বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার সংবাদে আতঙ্কিত বিশ্লেষকরা সংস্থাটির সক্ষমতাসংক্রান্ত বোয়িংয়ের একটি রিপোর্ট সামনে এনেছেন। ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৭৭৭/৭৮৭ অনসাইট এনহ্যান্সড সাপোর্ট ক্লোজ-আউট রিপোর্ট’ শীর্ষক বোয়িংয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের অন্য যেকোনো বহরের চেয়ে বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটি বেশি। মেরামতেও সময় লাগছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ। এতে বলা হয়, বিমানের উড়োজাহাজে মূলত জটিল কারিগরি ব্যবস্থাগুলোয় বেশি সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজে যন্ত্রাংশের ক্ষয় ও পুরোনো হয়ে যাওয়ার কারণে বেশি সমস্যা দেখা যায়।
বোয়িংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানের ৭৮৭ সিরিজের উড়োজাহাজে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে ব্রেক সিস্টেম কন্ট্রোল ইউনিটে। এ ইউনিটে ত্রুটির হার বিশ্বজুড়ে একই মডেলের উড়োজাহাজের গড় হারের চেয়ে ১৪ গুণ বেশি। অন্যদিকে বিমানের ৭৭৭ উড়োজাহাজে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়। এ ব্যবস্থায় ত্রুটির হার বিশ্বজুড়ে একই মডেলের উড়োজাহাজের গড় হারের চেয়ে ছয় থেকে সাত গুণ বেশি। বিমানের ৭৭৭ উড়োজাহাজে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সমস্যা হচ্ছে পণ্য পরিবহনের দরজায়। এ ক্ষেত্রে বিমানের ত্রুটির হার বিশ্বজুড়ে গড় হারের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাত বছর আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ শুরু হলেও এখনো চলমান। বিমানবন্দরে রয়েছে একটিমাত্র রানওয়ে। ফলে একসঙ্গে একটির বেশি বিমান অবতরণ করতে পারে না। অন্য আরেকটা রানওয়ে যোগ করার পরিকল্পনা কাগজেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজের বহর পরিচালনায় এয়ারলাইনসে আছে ২১৮ জন পাইলট ও ৬০০ কেবিন ক্রু।
আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে পাইলট দরকার অন্তত ৩০০ ও কেবিন ক্রু ৯০০ জন। নতুন উড়োজাহাজগুলো যুক্ত হলে ৭০০-৮৫০ জন পাইলট এবং ১০০০-১২০০ কেবিন ক্রু প্রয়োজন হবে। বহর বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শুধু ফ্লাইট সংখ্যা নয়, বাড়বে উড়োজাহাজের পার্কিং, মেইনটেন্যান্স, যাত্রী, লাগেজ, কার্গো এবং টার্নঅ্যারাউন্ডের চাপ। বিদ্যমান বহর পরিচালনাতেই যেখানে জনবল সঙ্কট, সেখানে একসঙ্গে কয়েক ডজন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে প্রয়োজনীয় জনবল কোথা থেকে আসবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে । এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কার্যকর পাইলট প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির মতো পুরোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে আধুনিকায়ন ও পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এতগুলো উড়োজাহাজ এলে সেগুলো কোথায় থাকবে এবং কোথায় মেইনটেন্যান্স হবে তার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে। এক্ষেত্রে সিলেট, কক্সবাজারসহ অন্যান্য বিমানবন্দরকে বিকল্পভাবে ব্যবহারের কথা বলছেন তারা।
সরকারি ভাষ্যমতে, দেশের বিমানযাত্রীদের মাত্র ২০ শতাংশ বিমান বহন করে। বাকি ৮০ শতাংশ যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইনস নিয়ে যায়। বিমানের বহর বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা দরকার। খরচ সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ায় এর নিজস্ব আয় এবং কিস্তির মাধ্যমে এই মূল্য পরিশোধ করা হবে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর সরাসরি চাপ ফেলবে না। তাছাড়া নতুন নতুন রুট সম্প্রসারণ এবং এভিয়েশন হাব তৈরির জন্য ঐতিহ্যবাহী বোয়িংয়ের পাশাপাশি মিশ্র বহর গড়ার তাগিদ রয়েছে। এসব কারণেই বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজগুলো যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
আর্থিক চাপের শঙ্কা নেই: তথ্য উপদেষ্টা
এতগুলো উড়োজাহাজ কিনলে অর্থনীতিতে সেটির চাপ পড়ার শঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-উর রহমান বলেন, সরকার খুবই খারাপ অর্থনীতি হাতে পেয়েছে এটা সত্য। তবে আমরা কেউ যদি মনে করি যে, আমাকে এক্ষুণি বা খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক টাকা দিয়ে দিতে হবে, ব্যাপারটা মোটেই তা না।
একটা রাষ্ট্র তার প্রয়োজন অনুযায়ী চলবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ক্রাইসিস থাকলেও রাষ্ট্র তার কিছু কিছু প্রয়োজন মেটাবে। সুতরাং নতুন যে উড়োজাহাজের অর্ডার রয়েছে, এটার কোনো ইমিডিয়েট এফেক্ট নাই। এগুলো হাতে পাওয়া আমাদের জন্য লম্বা সময়ের ব্যাপার। পেমেন্টও এখন থেকে ধাপে ধাপে অনেক দিন পর্যন্ত দেওয়া যাবে।
চাহিদার ভিত্তিতেই উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে: বিমানমন্ত্রী
নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সব ধরনের চাপের অভিযোগ অস্বীকার করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলছেন, বিমানের চাহিদার ভিত্তিতেই উড়োজাহাজগুলো কেনা হচ্ছে। যাত্রী চাহিদার আলোকে গঠিত বিমানের নেটওয়ার্ক ফ্লিট প্ল্যানিং, এয়ারক্রাফট রেঞ্জ, যাত্রী ধারণক্ষমতা, ফ্লাইটপ্রতি সম্ভাব্য যাত্রী এবং সাপ্তাহিক ফ্রিকোয়েন্সি বিবেচনায় ওয়াইড বডি ও ন্যারো বডির উড়োজাহাজের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিমানের বহর সম্প্রসারণে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি ছোট লিগ্যাসী ক্যারিয়ার থেকে এখন ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের বহরে ১৬৭টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ারে রয়েছে মাত্র ১৯টি। তার যুক্তি, ইথিওপিয়ার তুলনায় আমাদের জিডিপি বেশি এবং আমাদের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীও বেশি। বর্তমানে আমাদের মোট চাহিদার তুলনায় ২০ শতাংশের কিছু বেশি বিমান পরিবহন করতে পারছে। বাকি ৮০ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইনসের দখলে। তাই উড়োজাহাজ স্বল্পতা দূর করতে সরকার উড়োজাহাজ কেনার সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রভাব নেই।
যদিও গত ১ সেপ্টেম্বর বোয়িং কেনা নিয়ে বিমানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বাংলাদেশ কিনছে।’
এদিকে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকার ও বিমানকে লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোস্তফা মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার জনস্বার্থে গত ৭ সেপ্টেম্বর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এ লিগ্যাল নোটিস পাঠান। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব, অর্থ সচিব এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে।
বিমানের বহর সম্প্রসারণে বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার মেগা পরিকল্পনার সমান্তরালে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বেশকিছু সুনির্দিষ্ট ও জরুরি কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু নতুন উড়োজাহাজ কিনলেই হবে না, বরং বিমানকে বিশ্ববাজারে টিকিয়ে রাখতে হলে বিমানকে অ্যাডহক ভিত্তিতে বা আমলাতন্ত্রের অদক্ষ লোক দিয়ে পরিচালনার পরিবর্তে স্থায়ী, অভিজ্ঞ এবং বাণিজ্যিক মনোভাবসম্পন্ন এভিয়েশন পেশাদারদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।
আইটি অবকাঠামো এবং ডিজিটাল স্কিল উন্নত করতে হবে। এতে অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের সময় কমার পাশাপাশি টিকিটিং ও অপারেশনাল গতিশীলতা আসবে। নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার আগেই পর্যাপ্ত সংখ্যক পাইলট, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং কেবিন ক্রু তৈরি করতে হবে। অদক্ষ জনবল নিয়ে বড় বহর পরিচালনা করলে বিমান আরও বেশি লোকসানি ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। তাই আন্তর্জাতিক মানের লাইসেন্সিং ও ট্রেনিং নিশ্চিত করা জরুরি।