আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি, সিসিটিভিতে ধরা পড়েও শনাক্ত হচ্ছে না অটোরিকশা। একই রঙের নম্বর প্লেটে আড়াল হচ্ছে নিবন্ধন নম্বর, ব্যাহত হচ্ছে অপরাধ তদন্ত ও এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন প্রয়োগ। ভুয়া নম্বর প্লেট ও একই নম্বরে একাধিক গাড়ি চলার অভিযোগও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ।
রাজধানীর সড়কে অপরাধ তদন্ত ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নম্বর প্লেট। সবুজ রঙের অটোরিকশায় সবুজ নম্বর প্লেটের ওপর কালো অক্ষরে লেখা নিবন্ধন নম্বর দূর থেকে সহজে পড়া যায় না। বিশেষ করে রাতে কিংবা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে নম্বর অস্পষ্ট থাকায় অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মগবাজারে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়িতে গুলির ঘটনায় বিষয়টি সামনে এসেছে। হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি সবুজ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে এসেছিলেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আশপাশের ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করেও অটোরিকশাটি শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফুটেজে অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বর স্পষ্ট না হওয়ায় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শুধু এই ঘটনা নয়, একই সমস্যা রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক আইন প্রয়োগেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এআই ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের দৃশ্য ধরা পড়লেও নম্বর প্লেট থেকে গাড়ির নিবন্ধন নম্বর উদ্ধার করা না গেলে মালিককে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো কঠিন।
গত শনিবার ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ওই সময় তিনি বিশাল সেন্টারের তিনতলায় নিজের স্টুডিওতে ছিলেন। গাড়ির কাছেও ছিলেন না চালক।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, ঘটনার সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিশাল সেন্টারের সামনে এসে থামে। সেখান থেকে এক ব্যক্তি নেমে আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি করে আবার অটোরিকশায় উঠে মালিবাগের দিকে চলে যান। অটোরিকশায় আরও কেউ ছিলেন কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
চালকের আসন বরাবর পেছনের আসন লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি করা হয়। এতে গাড়ির গ্লাস ভেঙে যায়। হামলায় ব্যবহৃত অটোরিকশাটি শনাক্ত হয়েছে কি না, জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা চলছে। তবে এখনো সিএনজিটি শনাক্ত করা যায়নি। তাঁর আশা, অটোরিকশাটি শনাক্ত করার পাশাপাশি হামলাকারীকেও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা সবুজ রঙের। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেটও সবুজ; তার ওপর কালো অক্ষরে লেখা থাকে নিবন্ধন নম্বর। ফলে গাড়ির রং ও নম্বর প্লেটের রঙের মধ্যে পার্থক্য কম থাকায় দূর থেকে নম্বর পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। কম আলোতে সমস্যা আরও বাড়ে।
ট্রাফিক বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু ক্ষেত্রে নম্বর প্লেটের কালো অক্ষর ও সংখ্যা ঘষে তুলে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এতে নিবন্ধন নম্বর আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। কোনো যানবাহন অপরাধে ব্যবহৃত হলে কিংবা ট্রাফিক আইন ভাঙলে ক্যামেরার ফুটেজ থেকে সেটির নম্বর উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ক্ষেত্রেও এই সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। এআই ক্যামেরা কোনো যানবাহনের আইন লঙ্ঘনের দৃশ্য শনাক্ত করতে পারলেও নম্বর প্লেটের অক্ষর স্পষ্ট না হলে সঠিক নিবন্ধন নম্বর বের করা সম্ভব নাও হতে পারে। ভুল নম্বর শনাক্ত হলে নিরপরাধ গাড়ির মালিকের কাছে নোটিশ যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
ফলে ক্যামেরার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নম্বর প্লেটের মান, দৃশ্যমানতা ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নম্বর প্লেট নিয়ে উদ্বেগ শুধু দৃশ্যমানতার সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। ভুয়া নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার এবং একই নম্বর একাধিক অটোরিকশায় লাগানোর অভিযোগও রয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে একই নম্বর প্লেটে পাঁচ থেকে সাতটি অটোরিকশা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে নিবন্ধন-সংক্রান্ত নথি, চেসিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর, মালিকানার তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই নম্বর একাধিক গাড়িতে ব্যবহার করা হলে ক্যামেরায় নম্বর শনাক্ত হলেও প্রকৃত যানবাহন চিহ্নিত করতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া গাড়ি বিক্রির পর মালিকানা হস্তান্তর না করা, নিবন্ধনের তথ্য হালনাগাদ না থাকা এবং অনুমোদিত শ্রেণির বাইরে যানবাহন ব্যবহার করার মতো বিষয়ও নজরদারিতে আনা জরুরি।
অপরাধ তদন্তে নম্বর প্লেট গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও শুধু নম্বরের ভিত্তিতে চালক বা অপরাধীকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায় না। নিবন্ধিত মালিকের তথ্যের সঙ্গে ঘটনার সময়কার চালক, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখতে হয়। তবে নম্বরটি স্পষ্টভাবে পাওয়া গেলে তদন্তের প্রাথমিক ধাপ অনেকটাই সহজ হয়।
সমস্যা সমাধানে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় এসেছে।
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ বলেন, ঢাকায় নিবন্ধিত অটোরিকশার পাশাপাশি অবৈধ যানবাহনও চলাচল করে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত ব্যবহারের অটোরিকশার নিবন্ধন নিয়ে রং পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক যানবাহন হিসেবে চালান। তিনি বলেন, নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তনের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সহজ হলে সেটি সবার জন্যই ভালো হবে।
এদিকে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, সিএনজির রঙের সঙ্গে নম্বর প্লেটের রং মিলে যাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। দিনের বেলায় নম্বর কিছুটা বোঝা গেলেও রাতে তা স্পষ্ট দেখা যায় না। সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং-২) মো. ফারুক আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে ডিএমপির কোনো চিঠি এখনো তাঁরা পাননি। সড়ক পরিবহন বিধিমালা অনুযায়ী নম্বর প্লেটের রং নির্ধারিত রয়েছে। ডিএমপি আপত্তি জানালে বিধি অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
নজরদারি বাড়াতে প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা
রাজধানীর সড়কে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সিসিটিভি ও এআই ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু নম্বর প্লেট অস্পষ্ট থাকলে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভুয়া নম্বর প্লেট কিংবা একই নম্বর একাধিক গাড়িতে ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই না হলে অপরাধ তদন্তেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নম্বর প্লেটের দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা, নিয়মবহির্ভূত পরিবর্তন শনাক্ত করা, নিবন্ধনের তথ্য হালনাগাদ রাখা এবং সন্দেহজনক নম্বরের গাড়ি মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগ নিতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে বিআরটিএ ও পুলিশের সমন্বিত সিদ্ধান্ত জরুরি।
আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় অটোরিকশা শনাক্ত করতে পুলিশের বেগ পাওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে নম্বর প্লেটের এই সীমাবদ্ধতা। নম্বর প্লেট যদি গাড়ির পরিচয়ই স্পষ্ট করতে না পারে, তাহলে অপরাধী শনাক্ত থেকে শুরু করে সড়কে আইন প্রয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই নজরদারির বড় ফাঁক থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।