জাপানের বেসরকারি খাত আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করতে পারে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে বিশেষ অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে জাপান ও বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-এ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এতে বলা হয়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ নামে এগিয়ে নেওয়া হবে। এ উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যযোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে দুই দেশ।
এর মাধ্যমে শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো হবে।
এ জন্য চারটি ক্ষেত্রে কাজ করা হবে—যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা জোরদার করা।
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাপানের বেসরকারি খাত আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করতে পারে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ ঘোষণায়।
ঘোষণায় দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও শিল্পের বড় কেন্দ্রে গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেল লাইনের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করবে দুই দেশ।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি। অন্যদিকে বিনিয়োগ সহজ করতে কর, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ পাঠানো ও লাইসেন্স দেওয়ার মতো কার্যক্রমে নিয়মকানুন ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে।
দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও বাড়াতে জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানো এবং অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত তা কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন দুই নেতা। এ চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য রয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই ও ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম উত্তরণে এ চুক্তি সহায়তা করবে বলে যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতেও জাপান আগ্রহী।
বিশ্বে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি সই এবং কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার আওতায় একটি টহলজাহাজ দেওয়ার বিষয়টিও যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে।
এ ছাড়া জাপানের সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচির আওতায় আরও সহযোগিতার সুযোগ খোঁজার অঙ্গীকারও করেছেন তারা।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বড় অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল ও বন্দরের নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে জাপান।
মিয়ানমারের সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এর প্রভাব এবং রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
তারা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পরিবেশ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন।
রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন তাকাইচি। তাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাপানের সমর্থনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই হাতেই রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান বলে দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে জাপান ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জলবায়ু সহযোগিতাবিষয়ক আগ্রহপত্র সই হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছেন তারা।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের’ দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে সাংস্কৃতিক বিনিময়, জাপানবিষয়ক গবেষণা, জাপানি ভাষা শিক্ষা এবং শিক্ষাবৃত্তির মতো কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যৌথ ঘোষণায়।