জাপান সরকারের উন্নয়ন সহায়তার (ওডিএ) ঋণে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সংবেদনশীল সময় বিবেচনায় নিয়ে অন্তত ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য জাপানকে একটি দেশভিত্তিক 'ট্রানজিশনাল কনসেশনাল উইন্ডো' চালুর অনুরোধ জানাবে ঢাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শোহেই হারা-র সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বৈঠকে এ প্রস্তাব তোলা হবে।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে অর্থমন্ত্রী জাইকার পরিবর্তনশীল সুদহারের (ফ্লোটিং-রেট) ঋণের ঝুঁকি কমানোর পদক্ষেপ চাইতে পারেন। সেইসঙ্গে এ ধরনের ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা (ক্যাপ) নির্ধারণের প্রস্তাব দিতে পারেন। এছাড়া প্রয়োজনে পরিবর্তনশীল সুদের ঋণকে স্থির সুদহারে (ফিক্সড-রেট) রূপান্তরের সুযোগ রাখা কিংবা ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতার মধ্যে সুদহারের ঝুঁকি ভাগাভাগি করে নেওয়ার অন্য কোনো পদ্ধতি চালুরও আহ্বান জানাতে পারেন তিনি।
তারা আরও জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগের রূপান্তরকালীন সময়ে জাপানি ঋণের ক্রমবর্ধমান ব্যয় বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই বিশেষ এই রেয়াতি সুবিধার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
২০২০ সালের এপ্রিলে সংশ্লিষ্ট এলডিসি ও নিম্ন-আয়ের দেশের জন্য জাইকার স্ট্যান্ডার্ড স্থির সুদের হার ছিল মাত্র ০.৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া সংস্থাটির নতুন ঋণ শর্তাবলি অনুযায়ী, স্থির সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৫০ শতাংশ। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে সুদের হার পাঁচ গুণ বেড়েছে। এ ঋণের পরিশোধকাল ৩০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর।
জাপানি ওডিএর ঋণ যাতে বাজারভিত্তিক অর্থায়নের কাছাকাছি চলে না যায়, সে বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সুদহারের পরিবেশ ও জাপানের নিজস্ব অর্থায়ন পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে, এ বিষয়টি বাংলাদেশ উপলব্ধি করে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জাপানি ওডিএর নমনীয় বা রেয়াতি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য ইতিমধ্যে বাড়তি সময়ও চেয়েছে।
ইআরডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাইকার ঋণের সুদহার প্রতি ৬ মাস পরপর পুনর্নির্ধারণ হয়। গত অক্টোবরের আগে জাপানি ঋণের সুদহার ছিল ৩.০৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে হয়েছে ৩.৫ শতাংশ। আগামী ছয় মাস পর এ হার আরও বাড়তে পারে।
এদিকে এখন জাপান থেকে ফ্লোটিং রেটে ঋণ নিলে সুদহার হবে হবে ১.৮ শতাংশ। তবে ঋণচুক্তির পরেও দীর্ঘমেয়াদে এই সুদহার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিষয়টি এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, ছয় মাস মেয়াদি টোকিও টার্ম রিস্ক-ফ্রি রেটকে (টিওআরএফ) ভিত্তি হিসেবে ধরা হলে, বর্তমান ছয় মাসের রেফারেন্স বাজার হার দাঁড়ায় প্রায় ১.৩৫ শতাংশ। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট ০.৪৫ শতাংশ স্প্রেড যোগ হয়ে মোট সুদহার দাঁড়াবে প্রায় ১.৮০ শতাংশ।
টিওআরএফ বেড়ে যদি ১.৫০ শতাংশ হয়, তবে পরবর্তী চক্রে ১.৫০ শতাংশের সঙ্গে ০.৪৫ শতাংশ স্প্রেড যুক্ত হয়ে মোট সুদহার বেড়ে দাঁড়াবে ১.৯৫ শতাংশ।
সরকার মনে করছে, ভাসমান সুদ শুরুতে আকর্ষণীয় মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলেন, মধ্যমেয়াদি রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার জন্য ভবিষ্যতে কত অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে, তার পূর্বানুমানযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেট সহায়তা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতাকে শুধু প্রকল্পভিত্তিক ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাজেট সহায়তা ও নীতিভিত্তিক অর্থায়নের একটি নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোতে নিতে চায় বাংলাদেশ।
একইসঙ্গে জাইকার অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও বারবার মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা কমানো, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করতে চায় সরকার।
কর্মকর্তারা বলেন, বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান বার্তা হবে জাপানের নীতিভিত্তিক অর্থায়ন ও সরাসরি বাজেট সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে জরুরি সহায়তা চাইবে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনাগত ও কারিগরি সমস্যার বিষয়টি সরাসরি জাইকার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছে তুলতে পারেন অর্থমন্ত্রী।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বয়লার ও অন্যান্য সিস্টেম-সংক্রান্ত সমস্যাসহ বেশ কিছু অমীমাংসিত কারিগরি সমস্যার কথা উঠে এসেছে। এসব সমস্যার কারিগরি দায় নির্ধারণ ও সমাধানেও বিলম্বের বিষয় রয়েছে।
১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান সমস্যাগুলো মূলত কয়লা আমদানিতে দীর্ঘসূত্রিতা ও ডলার সংকটের কারণে সৃষ্ট সরবরাহ চেইন বা জ্বালানি সংকট, সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা, আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণে যান্ত্রিক ও কারিগরি বিরতি এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সঞ্চালন লাইনের কিছু সীমাবদ্ধতা।
পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত এসব সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায়ই পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে বা নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে নানা বাধার সম্মুখীন হয়।
জাইকার প্রকল্প বাছাইয়ে আরও সতর্ক হবে সরকার
জাইকার ঋণের সুদহার বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে প্রকল্প গ্রহণে আরও বাছাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন প্রকল্পগুলো দেশের বর্তমান উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
একইসঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে জাইকার সঙ্গে 'স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও' গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণের চেয়ে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগে প্রকল্পের অবদানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণসহ নতুন খাতে জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ
কর্মকর্তারা আরও জানান, জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও লজিস্টিকস (পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা) খাতের উন্নয়ন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের মতো সীমিত কিছু রপ্তানি পণ্যের ওপর বাংলাদেশের অতি-নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতার প্রচলিত ক্ষেত্রের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বন্ড মার্কেট, দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল রূপান্তর, ওষুধ ও স্বাস্থ্যশিল্পসহ নতুন কয়েকটি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। জাইকার সঙ্গে আসন্ন বৈঠকে এসব বিষয়ে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগের প্রস্তাব তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী।
কর্মকর্তারা আরও জানান, জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও লজিস্টিকস উন্নয়নের পাশাপাশি তৈরি পোশাকসহ সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর রপ্তানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়টি আলোচনায় থাকবে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.