২৫ বছর বয়সী রাশমণির জন্ম খুলনার লায়ন সার্কাসে। সেখানে অস্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষার কসরত, শোভাযাত্রা এবং সার্কাসের নানা খেলা শেখানোর জন্য বছরের পর বছর তাকে নির্যাতন ও অবহেলার মধ্যে রাখা হয়েছিল। এসব খেলা দেখিয়ে দর্শকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো।
এখন হাতিটি হবিগঞ্জের সুরমা চা-বাগানে থাকে। সেখানে প্রতিদিন সকালে তার খাবারের তালিকায় থাকে প্রায় ৫০টি কলাগাছ, ৩০টি ভুট্টাগাছ এবং গুড় মেশানো এক বালতি তুষ।
এখন সে নিজের ইচ্ছেমতো খেতে, ঘুমাতে ও গোসল করতে পারে। চা-বাগানের ভেতরেও স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছিল বন বিভাগ, প্রাণীকল্যাণ সংস্থা অভয়ারণ্য, সুরমা চা-বাগান এবং ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সহযোগিতায়।
বাংলাদেশে বন্দি হাতিদের আইনগত অবস্থান স্পষ্ট নয়। কিছু হাতিকে ছোট অবস্থায় বন্য পরিবেশ থেকে ধরে আনা হয়। আবার কিছু হাতির জন্ম হয় সার্কাসের আঙিনা কিংবা কাঠের গুদামে।
উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচ টন ওজনের একটি বন্য প্রাণীকে বাধ্য ও অনুগত করে তুলতে কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা একটি নির্যাতনমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এ পদ্ধতি 'হাদানি' বা নির্যাতনের মাধ্যমে বশ করার প্রক্রিয়া নামে পরিচিত।
এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত।
সাধারণত তিন থেকে ছয় বছর বয়সী একটি হাতিশাবককে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তার চার পা কাঠের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
কয়েক দিন ধরে তাকে খাবার ও পানি থেকে বঞ্চিত করে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়। এ সময় বারবার তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হয় 'আঙ্কুশ'। এটি কাঠের একটি দণ্ড, যার মাথায় পেছনের দিকে বাঁকানো ইস্পাতের হুক লাগানো থাকে।
হাতিশাবকটি প্রতিরোধ করা বন্ধ না করা পর্যন্ত তার গিঁট, মাথা এবং কানের পেছনের সংবেদনশীল ত্বকে বারবার আঘাত করা হয়।
হাতি সামাজিকভাবে অত্যন্ত জটিল আচরণ করে এবং অন্যের কষ্ট অনুভব করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে। তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের ফলে যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয়, তা অনেক সময় শরীরের ক্ষতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মায়ের সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাদানি পদ্ধতিতে নির্যাতনের শিকার হাতিশাবকদের মধ্যে প্রায়ই কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়। তারা বারবার মাথা দোলাতে থাকে কিংবা এক পাশ থেকে অন্য পাশে শরীর দোলায়।
সার্কাসের দর্শকেরা এসব আচরণকে অনেক সময় হাতির 'নাচ' বলে ভুল করেন।
রাশমণির জীবনে সার্কাসই ছিল পরিচিত একমাত্র জগৎ।
তার মাহুত মাসুদ বছরের পর বছর সার্কাসের মঞ্চে তাকে দিয়ে বিভিন্ন খেলা খেলিয়েছেন। একটি ছোট হাতিকে বাধ্য করতে কী ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো, তা জানতে চাইলে তিনি নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেননি। তবে পুরো প্রক্রিয়াটিও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেননি।
তিনি নির্বিকারভাবে বলেন, 'তখনকার সময়ে বিষয়গুলো আমরা এখনকার মতো বুঝতাম না। সার্কাসের খেলা শেখাতে হাতিকে দিয়ে অনেক কিছু করাতে হতো। জোর না করলে তাকে কীভাবে খেলা শেখাবেন? এখন এখানে তাকে এসব কিছুই করতে হয় না। প্রতিবার খাবারের সময় সে ভালো খাবার পায়। তার স্বাস্থ্যেরও অনেক উন্নতি হয়েছে। আমিও এখানে ভালো আছি।'
রাশমণিকে সার্কাস থেকে সরিয়ে আনার আইনি ও বাস্তব উদ্যোগ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অভয়ারণ্য বন বিভাগের সঙ্গে কাজ করে খুলনার লায়ন সার্কাস থেকে রাশমণিকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে পুনর্বাসনের জন্য তাকে কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
উদ্ধার করা বন্য প্রাণীদের রাখার জন্য সরকারের প্রধান আশ্রয়কেন্দ্র হলো গাজীপুরের সাফারি পার্ক। উদ্ধার করা অন্য কয়েকটি হাতিকেও সেখানে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একটি হাতির প্রয়োজনীয় যত্ন ও থাকার ব্যবস্থা করার মতো পর্যাপ্ত সুবিধা সেখানে নেই।
এর কয়েক মাস আগে নিহারকলি নামে আরেকটি সার্কাসের হাতিকে উদ্ধার করেছিল অভয়ারণ্য ও বন বিভাগ। তার ওপর নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সুরমা চা-বাগানের অন্যতম মালিক সাদিয়া মঈন অভয়ারণ্যের প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
রুবাইয়া বলেন, 'প্রথমে ধারণাটি অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি আমার মাথায় থেকে যায়। যখন খুলনা থেকে রাশমণিকে উদ্ধারের বিষয়টি বাস্তব হয়ে উঠল, তখন আমি হাতির পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করি। তারা নিশ্চিত করেন, এ ধরনের উদ্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে। চা-বাগানে হাতির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, পানি ও খাবার পাওয়া যায়। আর হাতি চা-পাতা খায় না।'
৩০ ডিসেম্বর সাদিয়াকে ফোন করেন রুবাইয়া।
সাদিয়া বলেন, 'রুবাইয়া যখন ফোন করেন, তখন আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা দ্রুত একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির কাজ শুরু করি। আমাদের বাংলোর কাছেই হাতিটিকে রাখার জন্য একটি জায়গা পরিষ্কার করি এবং চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করি।'
৩১ ডিসেম্বর হাতিটিকে স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়।
পাঁচ টন ওজনের একটি প্রাণীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে হলে ধীরে ও স্থিরভাবে গাড়ি চালাতে হয়। এতে হাতিটির পা পিছলে যাওয়া বা ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকি কমে।
১ জানুয়ারি রাশমণি হবিগঞ্জ থেকে খুলনায় পৌঁছায়।
রুবাইয়া বলেন, 'চা-বাগানে আনার সময় সে ভীষণ ভীত ছিল। তার পাঁজরের হাড়গুলো বেরিয়ে ছিল। চামড়া ছিল নিষ্প্রভ ও খসখসে। পেটে কৃমি থাকায় তার পেট ফুলে ছিল। বছরের পর বছর কংক্রিটের ওপর থাকার কারণে তার পায়ের অবস্থাও খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এখানে প্রথমবার খাবার দেওয়ার পর সে এতটাই ক্ষুধার্ত ছিল যে সব কলাগাছ খেয়ে ফেলেছিল।'
সার্কাসে থাকার সময় রাশমণির খাবারের প্রায় পুরোটাই ছিল শুকনো ধানের তুষ। এর সঙ্গে মাঝেমধ্যে কলাগাছের কাণ্ড ও পাউরুটি দেওয়া হতো।
শুরুতে চা-বাগানের কর্মীরা তাকে তাজা ফল ও মিষ্টি ভুট্টা খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার পরিপাকতন্ত্র এসব খাবার সহ্য করতে পারেনি।